সৈয়দ বদরুল আলম, নিজস্ব প্রতিনিধি: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশে এখন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সময়। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত গণতন্ত্র ঝুঁকিমুক্ত নয়।
কারণ নির্বাচনকে ঘিরে অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে।
আজ রোববার (৩১ আগস্ট) বিএনপির ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আইইবি মিলনায়তনে ‘বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য’ শীর্ষক আলোচনাসভায় লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, যতবারই দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল, গণতন্ত্র হত্যা করা হয়েছিল, দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ বারবার প্রতিবার দেশ এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় বিএনপির নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভলগ্নে দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। গণতন্ত্রকামী স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণ আপনারাই বিএনপির সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
তিনি বলেন, লাখো প্রাণের বিনিময়ে ৭১ এর স্বাধীন বাংলাদেশ ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের আধিপত্যবাদবিরোধী তাবেদারমুক্ত বাংলাদেশ...৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী বাংলাদেশ ২০২৪ এর ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ। এভাবে ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে দেশ এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিএনপি এবং গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির নেতা কর্মী সমর্থক যারা আত্মত্যাগ করেছেন, হতাহত হয়েছেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমি তাদের অবদানকেও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই। ফ্যাসিবাদ বিরোধী দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়, নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগে হাত পা চোখ হারানো শত শত আহত যোদ্ধার আর্তনাদের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এখন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সময় এবং সুযোগ এসেছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উপায় জাতীয় নির্বাচন।
যতক্ষণ পর্যন্ত একটি অবাধ সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষন পর্যন্ত গণতন্ত্র ঝুঁকিমুক্ত নয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আমি বেশ কয়েকমাস আগেও একবার বলেছিলাম, আগামী নির্বাচনাকে ঘিরে অদৃশ্য শক্তি কাজ করছে। জনগণ লক্ষ্য করতে শুরু করেছে, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ বিনষ্ট করার ক্ষেত্র প্রস্তুতে সেই অশুভ শক্তির অপতৎপরতা সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। পতিত, পরাজিত, পলাতক স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে হাটছে, তখন কোনো কোনো রাজনৈতিক দল নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নিজেদের ব্যক্তি এবং দলীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য নানা শর্ত আরোপ করে নির্বাচনে পথে পরিকল্পিত উপায়ে বাঁধা সৃষ্টির অপচেষ্টা শুরু করেছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথম থেকেই বিএনপি দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিলো। কারণ, বিএনপি মনে করে, আগে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রয়োজন। জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত নির্বাচিত সরকার জন প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে পরবর্তী নির্বাচনে জনগণ ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সুযোগ পাবে।
তিনি আরও বলেন, সুতরাং, পুঁথিগত সংস্কারের চেয়েও কার্যকর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে বেশি জরুরি। রাষ্ট্র রাজনীতি সংস্কারের ব্যাপারে বিএনপি সম্পূর্ণভাবে একমত। সংস্কারের গুরুত্ব আছে বলেই বিএনপি ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করার পরেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে নেয়া সংস্কার প্রস্তাবে সক্রিয়ভাবে সমর্থন এবং সহযোগিতা দিয়েছে। আমি আমার রাজপথের সহকর্মী সহযোদ্ধা প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের প্রতি আহবান জানিয়ে বলতে চাই, সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে, তবে জনগণের অধিকার চর্চা এবং প্রয়োগের পথে বাধা সৃষ্টি করে কোনো সংস্কারকেই টেকসই করা যাবেনা। পতিত, পরাজিত, পলাতক স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশে গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনগণের অভিপ্রায়ের সরকার। তবে এই সরকারের কাছে অবশ্যই একটি দক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সরকারের মতো পারফরম্যান্স আশা করার কোনো যৌক্তিক কারণ আছে বলে আমি মনে করিনা। সঙ্গত কারণেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যত বেশিদিন ক্ষমতায় থাকবে, তাদের দুর্বলতাও তত বেশি দৃশ্যমান হতে থাকবে।
বিভিন্ন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্বলতা যত বেশি প্রতীয়মান হবে, জুলাই গণ অভ্যুথান বিরোধী অপশক্তি ৫ আগষ্ট নিয়ে তত বেশি বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ পাবে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে আমাদের রাজপথের সহযোদ্ধা গণ অধিকার পরিষদ সভাপতি নুরুল হক নূরের উপর হামলাসহ সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় স্পষ্ট দেশের স্থিতিশীল পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
‘বিবেক’ হচ্ছে মানব সমাজের সবচেয়ে বড় আদালত। এই বিবেকের আদালতেই আজ আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা করা দরকার- ‘নির্বাচন হতে দেয়া হবেনা’ এই ধরণের উচ্চারণ ফ্যাসিবাদী বিরোধী শক্তির ঐক্যকে দুর্বল করবে? নাকি, পলাতক ফ্যাসিবাদী অপশক্তির পুনরুত্থানের প্রাসঙ্গিকতা তৈরী করবে? অতএব এখনো সময় আছে, আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। পতিত-পরাজিত-পলাতক অপশক্তি কিন্তু সুযোগের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে রয়েছে। পলাতক স্বৈরাচারের মতো বিএনপির বিজয় ঠেকানোর অপরাজনীতির পরিবর্তে আসুন আগে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের বাংলাদেশে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এরপর রাজনৈতিক দলগুলোর আরও সকল যৌক্তিক দাবিগুলোর সমাধানের পথ খুঁজি। রাষ্ট্র রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শর্ত শিথিল করে নির্বাচনের পথে হাঁটাই এখন সময়ের দাবি। জনগণের ভোটের অধিকার প্রয়োগ করে নির্বাচন কেন্দ্রিক গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে যদি আমরা রাষ্ট্র এবং সমাজে, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারি আমার বিশ্বাস, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক দাবিগুলো সময়ের সাথে সাথে বাস্তবায়নের পথ সহজ হয়ে যাবে। এবার আমি সারাদেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী সমর্থকদের উদ্দেশ্যে কয়েকটি কথা বলতে চাই। বিএনপি মনে করে, রাজনীতি মানেই শুধু প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়। রাজনীতি মানে জনগণের ‘জীবন মানের উন্নয়ন’।
‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণ। সেই লক্ষ্যেই বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিএনপি কি ধরণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা প্রণয়ন করেছে বেশ কিছু বিষয়ে ইতোমধ্যেই একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। বিএনপি শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেনি। কিভাবে, কোন উপায়ে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে সে ব্যাপারেও বিএনপির ‘পেপার ওয়ার্ক’ চূড়ান্ত পর্যায়ে। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের প্রতি আমার আহবান, বিএনপি গৃহীত পদক্ষেপগুলো সারা দেশে মা-বোন, তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার জনগণের কাছে পৌঁছে দিন। জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখুন। মব ভায়োলেন্সকে প্রশ্রয় দেবেন না। নারীর সন্মান মর্যাদা এবং অধিকারের প্রতি সংবেদনশীল এবং শ্রদ্ধাশীল থাকুন। সতর্ক থাকবেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নানারকম ষড়যন্ত্রের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। তবে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে কোনো ষড়যন্ত্রই বিএনপির অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারবেনা ইনশাআল্লাহ। ৪৭ বছরের গৌরবান্বিত পথচলায় বিএনপি বরাবরই দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের সহযোগিতা সমর্থন পেয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, তাই আসুন, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে জনগণের কাছে আমরা আবারো প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, গণতন্ত্র-ন্যায় বিচার-আইনের শাসন এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ থেকে অতীতে বিচ্যুত হয়নি। ভবিষ্যতেও হবেনা। দেশের প্রতিটি ক্রান্তিলঘ্নে বারবার প্রমাণিত হয়েছে, জনগণ বিএনপিকে বিশ্বাস করে। বিএনপি জনগণকে বিশ্বাস করে। সবশেষে আমি বলতে চাই, আমার দল-আপনার দল-আমাদের দল বিএনপির শেকড় এই বাংলাদেশ। ‘জনশক্তি জনবল বিএনপির মনোবল’।